Archive for মার্চ , ২০১৫

দেয়ালিকা প্রচ্ছদ

কলেজ দেয়ালিকা [ মার্চ, ২০১৫] : পর্ব ৪

বন্ধুত্ব

সিফাত উল হক (ছাত্র)


এই ব্যক্তিকে যখন থেকে চিনি তখন আমি এবং এই ব্যক্তি দুজনেই ক্লাস ওয়ানে পড়তাম। ক্লাস থ্রি পর্যন্ত সে অন্য সেকশনে ছিল এবং ততদিন আমি তার নাম জানতাম “উল্লাস” ! ক্লাস ফোরে উঠে একই সেকশনে হওয়ার পর জানলাম তার নাম আসলে “উচ্ছ্বাস”। যদিও পরবর্তীতে তার নামটার বহুরকম চেহারা বানায় দিয়েছিলাম আমি একক কৃতিত্বে । সেই সময় থেকে এসএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত সব পরীক্ষায় হয় উচ্ছ্বাসের সিট আমার সামনে থাকতো,নাহলে আমার সিট উচ্ছ্বাসের সামনে থাকতো! [ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষায় আমার সিটের পিছে দেয়াল ছিল জন্য উচ্ছ্বাসের সিট পাশের লাইনে ফার্স্ট বেঞ্চে চলে গেছিল! ]

স্কুলজীবনে বেশিরভাগ সময় আমি আর উচ্ছ্বাস পাশাপাশি বসতাম। এবং আমাকে আর উচ্ছ্বাস কে একই বেঞ্চে পাশাপাশি বসতে দেখলেই ঐ বেঞ্চে আর কেউ বসতে চাইতো না। কারণ আমি এবং উচ্ছ্বাস দুইজনেই নিজেদের বসার জায়গার বিষয়ে অতিরিক্ত সচেতন ছিলাম। “দরকার হলে পেন্সিল কম্পাস,কাঁটা কম্পাস দিয়ে মেপে দেখবো,তবুও সিটবেঞ্চে আমার ভাগের জায়গার এক সেন্টিমিটারও ওকে দিব না।” – এই ছিল আমার আর উচ্ছ্বাসের মূলনীতি! ফলাফল যেটা হতো তা হলো কে কার জায়গার এক সেন্টিমিটার না হাফ সেন্টিমিটার দখল করছে তা নিয়ে শুরু হতো গণ্ডগোল এবং ঐ এক/হাফ সেমি জায়গা উদ্ধারের আপ্রাণ চেষ্টা! বেঞ্চে বাকি কেউ বসলে তাদের অবস্থা করুণ হয়ে যেত! এছাড়া “শান্তিচুক্তি” নামক চুক্তির মাধ্যমে একটা নির্দিষ্ট সময়ে (কড়া স্যার/ম্যাডামের ক্লাসে ঝাড়ি খাওয়ার ভয়ে ) আমি আর উচ্ছ্বাস জায়গা নিয়ে ঝামেলা থেকে বিরত থাকতাম!

এছাড়া স্কুলজীবনে উচ্ছ্বাসকে যত উপায়ে সম্ভব জ্বালানো বা ক্ষেপানোই ছিল সবার প্রধান কাজ! আর যেহেতু সে সবচেয়ে ভদ্র ছিল এবং সহজে প্রতিবাদ করতো না,তাই স্কুলে যত আকাম করতাম,সব দোষ চাপায় দিতাম উচ্ছ্বাসের ঘাড়ে,এমনকি সে ঐদিন স্কুলে না গেলেও দোষ দিয়ে দিতাম ওর নামে! এমনই অভ্যাস হয়ে গেছিল যে একদিন পরীক্ষার আগে বাসায় আম্মু পাশের রুম থেকে জিঞ্জেস করছে “টিভি কে ছাড়ছে?” উত্তর দিছিলাম “উচ্ছ্বাস ছাড়ছে!” [ উচ্ছ্বাস কে দেখে একদম ভাল ছেলে মনে হলেও,অতটাও ভাল ভাবা উচিত না। বদ কমও না খুব একটা। ]

স্কুললাইফ শেষে উচ্ছ্বাস রাজশাহী কলেজে আর আমি নিউ ডিগ্রী তে ভর্তি হওয়ায় ঐভাবে বসা নিয়ে হিসাব আর কখনো করা হয় নি। পরীক্ষার হলে এখনো মাঝে মাঝে ঘাড় ঘুরায়ে ওকে দেখতে না পেয়ে প্রথমে একটু অবাক হয়ে পরে খেয়াল হয় আমরা আলাদা কলেজে পড়ছি। স্কুললাইফ টা অনেক মিস করি। ভবিষ্যতে উচ্ছ্বাস বুয়েটে চান্স পাবেই,আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি। আমি কই পাবো বা আদৌ কোথাও চান্স পাবো কিনা জানি না। যেখানেই থাকবি,ভাল থাকবি।দোয়া করি। শুভ জন্মদিন।

কলেজ দেয়ালিকা [ মার্চ, ২০১৫ ] : পর্ব ৩

৭১ এর কঙ্কাল

মোঃ নাজমুল হক (প্রভাষক, ইংরেজি)


কঙ্কাল কথা বলতে পারেনা-
তারা বলে,
তবে কেন আমি শুনতে পাই এই নীরব আর্তনাদ ,
এ কোন নীরবতা –
গুমরে কাঁদে ফেরে গণকবরের আকাশ বাতাস ?
কঙ্কালরাও কথা বলতে পারে
হ্যা, কঙ্কালরাও কথা বলে –
আমাদের মত জীবন-মৃত রা যেখানে নিঃশ্চুপ
কঙ্কালরাও সেখানে কথা বলে ওঠে
আরও কঠিন দৃঢ়তায় ।

কঙ্কাল দেখতে পারেনা-
তারা বলে,
তবে কেন আমি দেখি সেই আতংকিত অপলক দৃষ্টি ,
বয়োনেটের খোঁচায় উৎপাটিত চোখ
করোটির গর্তে পচে গলে যাওয়া চোখ;
কঙ্কাল অবশ্যই চোখে দেখে
আমরা যখন দেখেও চোখ বন্ধ করি
সে তখনও দেখে
আরও গভীরতর স্পষ্টতায় ।

পবিত্র পলি বিধৌত আমাদের এই ছোট্ট বদ্বীপে
স্বাধীনতা লুন্ঠিত হয়েছিল একবার
সেদিন দেখেছি বিবস্ত্র পতিতার মত
মানবতার নগ্ন নৃত্য
সেদিন ৭১ এর হিংস্র শকুনেরা
ধর্মের পোশাক পড়ে মেতে উঠেছিল
এক ধর্মহীন প্রাগৈতিহাসিক পাশবিকতায় ।

মাটির পাঁজরে চোখ বুজে ঘুমিয়ে
আর কত দিন?
চেয়ে দেখ গণকবরের মাটি খুঁড়ে আজ
বেরিয়ে আসে একেকটি জীবন্ত কঙ্কাল ।
আমাদের বিবেকের দরজায় দাঁড়িয়ে
অবিরত কড়া নেড়ে যায় একটু খানি বিচারের আশায় ।
একজন নিহত পিতার রক্তাক্ত শরীর-
একজন ধর্ষিত বোনের অসহায় আর্তনাদ-
আজ তীব্র বজ্রপাতের মত ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে ওঠে
বাংলার আকাশ বাতাস ।

কোন সাহসে আমি আজ ভুলেছি
আমার নিজের জাতিসত্ত্বা- ভুলেছি নিজের শিকড়;
বিবেকের কাছে মুখ লুকিয়ে
এভাবে আর কত দিন?
চেয়ে দেখ দিগন্ত আকাশে জমে উঠেছে ঘন কালো মেঘ,
কালবোশেখী আসন্নপ্রায়-
একজন ভাইয়ের লাশ,
একজন মায়ের অশ্রুবিন্দু ,
একজন বোনের লজ্জা,-
নিঃশব্দ আর্তনাদে আজ ছাড়খার করে দেয়
বাংলার পথ প্রান্তর ।